২২শে মার্চ বিশ্ব-জলদিবস : জলকে জলের মতো খরচ নয়

  • ড: শুভ্র মুখোপাধ‍্যায় 

ড: শুভ্র মুখোপাধ‍্যায়  হুগলী মহসীন কলেজের প্রাক্তন অধ‍্যক্ষ। বিজ্ঞান আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সংগঠক ও মুক্তমন পত্রিকার নিয়মিত লেখক।

আজ বিশ্বের দুশো কোটির বেশি সংখ্যায় মানুষের কাছে পেয় জলের কোনো সুবন্দোবস্ত নেই। অথচ রাষ্ট্রপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে গত প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বের মানুষের কাছে জলসম্পদের সুস্ঠু পোষণযোগ্য বা সুস্থিত (sustainable) ব্যবহারের কথা তুলে ধরতে, সতর্ক করতে আর জনসচেতনতা প্রসারে, ২২শে মার্চ, এই বিশেষ দিনটি জলদিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই বছরের জলদিবসের মূল ভাবনা ভূগর্ভস্থ জল: চোখের সামনে নেই তবু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কতকিছুই (Groundwater-Making the Invisible Visible)। সারা বিশ্বের বিশাল অংশে মাটির নিচে জলের ভান্ডারে টান পড়তে শুরু করেছে। মনে রাখতে হবে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে “মাটির বুকের মাঝে বন্দী যে জল মিলিয়ে থাকে” সেই লুকোনো জল আমাদের সভ্যতার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রথমেই জানিয়ে রাখি গত একশো বছরে নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস ক্রমাগত যেমন ডেকে এনেছে খরা, অনাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তেমনই ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটির নিচের জলের ভাণ্ডার। ‘মাটির বুকের মাঝে বন্দী’ ভূগর্ভস্থ জলকে গাছের মূল বাতাসে পৌঁছে দেয়; গাছের  বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায়। সেই বাষ্প নির্ভর করেই মেঘ ও বৃষ্টি। জলচক্রের একটা বড়ো অংশে তাই অরণ্য নির্ভর। তাই প্রাকৃতিক বনাঞ্চল হারাতে থাকলে আমরা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারি; হারাতে পারি ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারগুলিকে।

ভারতে গত ২০০২ থেকে ২০১৬-সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ জলস্তর প্রতি বছর ১০-২৫ মিমি করে কমেছে। জলস্তর নেমে যাওয়ায় এ দেশের ৫৪% বোর-ওয়েল আজ অকেজো। সরকারি রিপোর্ট জানাচ্ছে এমন যথেচ্ছ ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার হতে থাকলে আগামী ২০৩০-র মধ্যে ভারতের ৪০% জনগণের জন্য পানীয় জলের যোগান ব্যাহত হবে। বিগত বারো বছরে গোটা কলকাতায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর ৭ মিটার থেকে নেমে ১১ – ২০ মিটারে গেছে। পানীয় জলের অভাবে এখনই বিপন্ন বোধ করছেন অনেক বোর-ওয়েল নির্ভর বহুতল বাসিন্দা। কলকাতার পূর্ব দিকের বিস্তৃত জলাভূমি আর পশ্চিমদিকে বহমান গঙ্গা এতোকাল আমাদের ভরসা জুগিয়েছে। কিন্তু মানুষের নানান চাহিদার জোগান দিতে ক্রমাগত জলাভূমি সংকুচিত ও দূষিত হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক উপায়ে শোধিত ভূগর্ভস্থ জলের ভাঁড়ারের সম্পূরণ ব্যাহত। আবার অপরদিকে শীতের শুরু থেকে শুখা মরশুমের শেষ অবধি গঙ্গার জল এতো কমে যাচ্ছে যে কতোদিন সেই জল পরিশ্রুত করে পানীয় জলের জোগানে ব্যবহার করা যাবে সেটি এখন বড়ো প্রশ্নচিহ্নের মুখে।  ছোটো-বড়ো অনেক নদীই শুখা সময়ে জলে ভরে থাকতো তার বড়ো কারণ ছিল সেইসব নদী তলদেশের সঙ্গে মাটির নিচের জলস্তরের যোগাযোগ থাকতো। অবস্থানগত কারণে সেইসব অলক্ষ্যে থাকা জলের ভাণ্ডার নদীগুলিকে সারা বছর পুষ্ট রাখতো। আইআইটির গবেষণায় জানা যাচ্ছে মাটির নিচের জলের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাওয়ায় অনেক ছোটো নদীই বছরের একসময় সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের নানান দোহাই-এ শহর-মফস্বলের বিস্তৃত ভূপৃষ্ঠ কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বিচারে পুকুর, খাল, নয়ানজুলি, জলা বুজিয়ে নগরায়ন প্রসারিত হচ্ছে দ্রুত। তাই বৃষ্টির জল পুনরায় ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারকে পূর্ণ করতে পারছেনা। বোর-ওয়েল নির্ভর কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের বাসিন্দা আজ যাকে সাময়িক অসুবিধে মনে করছেন ও ক্রমাগত পাইপের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে সমস্যার হাল করে নিশ্চিন্তে আছেন, জানবেন আগামী দিন কিন্তু শুষ্ক জলহীন হতে দেরি নেই। ভূগর্ভস্থ জল শেষ হয়ে গেলে বাড়তে থাকবে মাটি বসে যাওয়ার মতো ঘটনা। আমরা সম্প্রতি মেট্রো রেলের কাজের সময় মাটির নীচের জল সরে গিয়ে কি বিপত্তি ঘটিয়েছে সেকথা জানি। বিভিন্ন অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠের অবনমন এখন প্রায়ই খবর হচ্ছে। চেন্নাই শহরের নানান অঞ্চলে এই অবনমনের পরিমাপ বছরে ১১ থেকে ১৪ মিমি।

যারা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন তাঁরা জানেন শুদ্ধ পানীয় জলের জন্য চালু টিউব-ওয়েলের থেকে অকেজো জলশূন্য কলের সংখ্যা বেশি। পূর্ব ভারতের গ্রামগুলোতে চাষের কাজে তিন-চার দশক আগে থেকেই ‘শ্যালো পাম্প’ বসিয়ে অনতিগভীর ভূগর্ভস্থ জল দিয়ে চাষে সেচের  কাজ হয়েছে। সেচের খাল তৈরির খরচ ও আনুসঙ্গিক ঝামেলা এড়াতে আমরা ‘শ্যালো’-র চাষকে উৎসাহ দিয়েছি; পাম্পের বিদ্যুৎ খরচ মকুব করে দেওয়া হয়েছে। ফলত্ঃ ভূগর্ভস্থ জলের ভাঁড়ার যেমন শূন্য হয়েছে তেমনি আর্সেনিক দূষনণে দূষিত হয়েছে ভূগর্ভস্থ জল। দেখা যাচ্ছে আমাদের এই বাঙলার বর্ধমান জেলা, যেটি আমাদের ভাতের যোগানের জন্য সবচেয়ে জরুরি অঞ্চল, সেখানেই গত ২০১৩ থেকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গেছে সর্বাধিক; বছরে গড়ে প্রায় ১১মিমি। যেখানে আমরা শ্যালো বা ডীপ বোর ওয়েল থেকে জল সংগ্রহ করি সেখানে মাটি যে রকমই হোকনা কেন, পাথুরে, ল্য‌াটেরাইট বা রুক্ষ, বৃষ্টির জল ঠিকই চুঁইয়ে ভূগর্ভে চলে যায়। কিন্তু মাটির ওপরে চারপাশ যেন কখনো পুরু কংক্রিটের জল নিরোধক আস্তরণে ঢাকা না পড়ে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পথ খোলা থাকলে বর্ষার জল আবার খরচ হয়ে যাওয়া ভাঁড়ার ভরে তুলতে পারবে। আবার দেখা যায় শ্যালো বা ডীপ সব বোর ওয়েলেই এক সময় না এক সময় শুকনো হয়ে যায়। এইসব শুকিয়ে যাওয়া বোর ওয়েলের উপরে একটি পারকোলেশন পিট তৈরি করে মাটির তলায় জল পাঠানোর ব্য‌বস্থা সহজেই করা সম্ভব। শুধু এর জন্য‌ দরকার সদিচ্ছা ও সচেতনতা।

মাথাপিছু গড়ে দৈনিক জলের খরচ আমাদের ৬০০ লিটার যেটি চেন্নাই (৮৪ লিটার), ব্যাঙ্গালোর (১০০ লিটার) কিম্বা মুম্বাই-র (১৭০ লিটার) চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বেশি। এই বিশাল খরচের অধিকাংশই অপচয়। সতর্ক হয়ে সেই অপচয় বন্ধ করতে হবে। উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত ঘরে ঘরে এখন রিভার্স অসমোসিস জল শোধন ব্যবস্থা। যেখানে এক লিটার জন শোধন করতে অপচয় হয় গড়ে ৬ লিটার জল। এমন দিনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপচয় হয় বিপুল পরিমাণ শুদ্ধ জল। শুধুমাত্র জল ব্যবহারে অবহেলা আর অসচেতনতার কারণে।আমাদের ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো কড়া আইনি রক্ষাকবচ না থাকার কারণে বিজ্ঞানসম্মত সর্বেক্ষণ ছাড়াই যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে চলেছে মাটির নিচের জলের ভাণ্ডার। আশার কথা, ২০২০-র ভূগর্ভস্থ জল আইন সম্প্রতি লাগু  হয়েছে। এখন দেখার সেই আইন পরিবেশের স্বার্থে কতখানি কর্যকর করা হয়। 

জল ব্যবহারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত হয়েছে State Water Investigation Directorate (SWID) এবং Water Resources Investigation and Development Department (WRIDD) তার উদ্যোগে চালু হতে চলেছে Minor Irrigation Census (MIC)। এসব উদ্যোগই আমাদের রাজ্যের মাটির ওপরের ও নিচের জলের সুষ্ঠু বিজ্ঞানসম্মত সুস্থিত ব্যবহারের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে আশা করা যায়। বৃষ্টির জল ধরে রেখে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ কার্যকর গতি পেলে যথেচ্ছ ভূগর্ভস্থ জলের অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত ভূগর্ভস্থ জলের অপচয় কমাতে বিশেষ সহায়ক হবে। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা জলের শোধন ও পুনর্ব্যবহার  নিয়ে সারা বিশ্ব চিন্তিত। নতুন নতুন পথের হদিস পাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো পরিসরে সেসব আলোচনা করা যাবে। আজ এই ২২-শে মার্চ ভূগর্ভস্থ জল ও তার সাথে বাস্তুতন্ত্রের সম্পর্ক বিষয়ে সচেতন হবার দিন। জনসচেতনতা প্রসারে সকলের আগুয়ান হবার দিন। জলকে ‘জলের মতো খরচ’ করার পরিণতি ভয়ঙ্কর, শুধু এটুকুই মনে রাখার আর মনে করিয়ে দেবার দিন এই জলদিবসটি।



Categories: Uncategorized

Tags: ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: