অসাম্যের গণতন্ত্র

লেখক পরিচিতি : প্রদীপ চক্রবর্তী ।  বেঙ্গালুরু তে তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি – Oracle ইউনিভার্সিটি তে [ Learning division of Oracle ] কর্মরত ডিরেক্টর ।

গত ১৫ অগাস্ট  আমাদের স্বাধীনতার ৭২ বছর পেরিয়ে গেলো । দক্ষিণ ভারতের তথ্য প্রযুক্তি  কেন্দ্রস্থল শহরে যে এলাকাতে  থাকি, সকাল বেলা  কিছু মানুষের উদ্যোগে দেশের পতাকা উত্তোলনের  সাক্ষী  হলাম । পতাকা যেখানে উঠলো সেখানে বড়  একটা   গান্ধীজির ফটোতে গোটা দশ -বারো মালা পরানো , আর ধুপ জ্বালানো, জাতীয় সংগীত , গলা উঁচু করে ভারত মাতার জয়, তারপর চা বিস্কুট। এর পরে আমরা কয়েকজন যাই এক প্রতিবেশী তামিল ব্রাহ্মণএর ঘরে ; এর মধ্যে টেলিভশন এ শুরু হয়েছে জাতির উদ্যেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ । কথায় কথায় উঠে এলো আমাদের দেশে আমাদের সমাজে নানারকম বৈষম্যের কথা । প্রতিবেশী মানুষটি বয়োজ্য়েষ্ঠ, অতি সজ্জন অবসরপ্রাপ্ত ভারত সরকারের উচপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার আধিকারিক ।   আমি প্রশ্ন করে বসেছিলাম – “এতো ধর্ম পুজো এসব নিয়ে থাকার কারণ কি ? ধর্মেও তো চরম বৈষ্যম্য , ধর্ম ই মানুষকে বিভাজন করে , আসল সব সমস্যা নিয়ে আলোচনা বা প্রতিবাদ করা থেকে ভুলিয়ে রেখেছে “  এক ধর্মভীরু প্রবল ধর্মবিশ্বাসী মানুষটির উত্তর শুনে কিন্ত মনে হলো না উনি একটুও আঘাত পেয়েছেন । উনি বললেন – “এটা সত্যি , মন্দিরে মসজিদ এ সর্বত্র আজকাল ধর্মের নামে অধর্মই হচ্ছে বেশি , সর্বত্র টাকার খেলা , টাকা দিয়ে ধর্ম ও  কেনা হচ্ছে ।   কিন্তু আসলে ধর্ম যে ভগবানের কথা বলে সেই ভগবানের চোখে সব মানুষই সমান । চারিদিকে দূষিত রাজনীতি বা সমাজে এই কারণেই ধর্ম আমার কাছে এক আত্মবিশ্বাস আর মুক্তি ফিরে পাবার জায়গা । অসাম্য ধর্মে নয়, অসাম্য বা বৈষম্য  তৈরি করা হয়েছে ধর্মাচরণে ।“ –  বুঝলাম উনি যা বললেন হয়তো দেওয়ালে কাজী নজরুল থাকলে আমাদের আলোচনা তে তার আপত্তি হতো না ।

এর পর আরো ইচ্ছে মতো প্রশ্ন করার বাধা থাকে না । মুক্ত মনে প্রশ্ন না করলে আমরা কিভাবে উত্তর খুঁজবো? আমাদের মধ্যেই একজন কাজ করেন ডেটা  সাইন্স [ Data Science] , আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডেটা  ইন্টেলিজেন্স এসব নিয়ে ।   ডেটা  বা তথ্য  নিয়ে তার খুব আগ্রহ । ডেটা  তথ্য দিয়েই না কি সব সমস্যা র মূল পাওয়া যাবে,  আর সাথে সমাধানের রাস্তাও । সুতরাং আমার প্রসঙ্গে উঠে এলো অর্থনৈতিক বৈষ্যম্য এর ডেটা  বা তথ্য । আমাদের ভারতে এবং পৃথিবী তে কিভাবে সমাজের শতকরা এক থেকে দশ ভাগের হাতে সত্তর থেকে আশি পার্সেন্ট এর বেশি পৃথিবীর সব সম্পদ জমে গেলো , মানুষের মাঝে আয়ের চরম বৈষম্য র ডেটা -তথ্য আমাদের দেখাচ্ছে কিভাবে সমাজ কে আরো ধনী আর দরিদ্র এ ক্রমাগত ভাগ করে চলেছে , এই সম্পদ আর আয়ে র অভাবনীয় মেরু করণের   নাগপাশ থেকে মুক্তি কিভাবে পেতে পারি – অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা মুক্তি ছাড়া কিসের স্বাধীনতা ? ডেটা  বা তথ্য চিৎকার করে বলতে চাইছে বৈষম্য র কথা , আর এই বৈষম্য নিয়ে কিসের গণতন্ত্র ? গণতন্ত্র মানে কি? গণতন্ত্রে র data , গণতন্ত্রে র তথ্য কোথায়? – যা দেখাবে  “ for the people, of the people, by the people” ?    

আগ্রহ নিয়ে সবাই শুনছেন । তথ্য দিয়ে বৈষ্যম্য বলতে হবে ।  এই ব্যাপারে আজকাল তথ্য আছে । বিশ্বের নামকরা ধনী দের ব্যাঙ্ক   Credit Swisse ব্যাঙ্ক এর নিয়মিত প্রকাশ  করা “গ্লোবাল ওয়েলথ ডেটা  বুক” , ওয়ার্ল্ড ইন-ইকুয়ালিটি ল্যাব , আই এম  এফ , ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এর তথ্য , অনেক অর্থ নীতিবিদ দের রিসার্চ করা তথ্য । এটা তাহলে অবিশ্বাস করার তথ্য নয়, আমরা যা কে বলি “ঘোড়ার মুখের তথ্য” । মাত্র চার বছর আগে ব্লকবাস্টার বেস্ট সেলার বই – আমেরিকার হার্ভার্ড এ হুড়োহুড়ি পরে গেল ওই বই নিয়ে – ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি র লেখা “ক্যাপিটাল ইন দা টোয়েন্টি  ফার্স্ট সেঞ্চুরি” । থমাস পিকেটি র বক্তব্য যে এর আগে এত তথ্য দিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য এর ব্যাখ্যা আর কেউ চেষ্টা করেন নি।

থমাস পিকেটি র পনেরো বছরের শ্রম । পৃথিবীর অনেকগুলো ধনী দেশের দুশো বছরের বেশি তথ্য। সরকারি কর এর থেকে পাওয়া তথ্য । হয়তো এর বাইরেও আছে কিছু তথ্য, যা আসে নি , যেমন কালো টাকা , কালো সম্পদ , বৈষম্যের ছবি আরো ভয়াল হতে পারে তাতে , তবু এই তথ্য আমরা নিতেই পারি । কি ভাবে সমাজের উঁচু তলার দশ পার্সেন্ট এর হাতে সম্পদ জমেছে, বা  সমাজের উঁচু তলার দশ পার্সেন্ট এর আয়ে র পরিসংখ্যান । সমাজের নিচু তলার অর্ধেকের ও বেশি র কোনো সম্পদই  নেই ।  সম্পদ আর আয়ের বৃদ্ধির অনুপাত কিভাবে হয়েছে । ধনী মানুষের সম্পদের যে অংশ ব্যবসায়ে খেটেছে যা পুঁজি , তা বেড়েছে জাতীয় আয়ের থেকেও বেশি হারে, ফলে সম্পদের এবং আয়েরও বৈষম্য  বেড়ে  চলেছে  এবং বেশি হারে পুঁজির  বৃদ্ধি আরো তীব্র করছে আয়ের বৈষম্য ।  বিজ্ঞান নতুন প্রযুক্তি র দৌলতে পুঁজি র দৌড় বা গতিবেগ  সাধারণ মানুষের শ্রমের থেকে বেশি , শ্রমের ভূমিকা কম হলেও ক্ষতি নেই । পিকেটি বলতে চাইলেন সম্পদের বৈষম্য আরো বাড়তে থাকবে । এটা গণতন্ত্রের পক্ষ্যে  ভালো হতে পারে না ।  উপায় কি ? সম্পদের বৃদ্ধি কে রাশ ? সারা পৃথিবী জুড়ে চালু হোক সম্পদের উপর কর , সম্পদের এক অংশ ফিরিয়ে নিয়ে আসা হোক সাধারণ মানুষের সবার জন্য ।  থমাস পিকেটি র  এই ঔষুধ বা প্রেসক্রিপশন এ আমাদের আপত্তি র কারণ থাকতে পারে না , সম্পত্তি  কর তো কিছু রাষ্ট্রে রয়েছে , কিন্তু প্রশ্ন হলো , ধনী মানুষের দ্বারা পরিচালিত যে গণতন্ত্র,  তাতে সারা পৃথিবী জুড়ে এই  সম্পত্তি  কর  এর চালু করার দায়িত্ব কে নেবে ?

আডাম স্মিথ, ম্যালথাস থেকে শুরু করে রিকার্ডো, মার্শাল, কার্ল মার্কস , কিনস , ফ্রিডম্যান  , সাইমন কুজনেৎস , পিয়েরো শ্রাফা, স্যামুয়েলসন, অমর্ত্য  সেন , মোদিগ্লিয়ানি এবং আরো অনেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অনেক অতীত থেকেও এবং বর্তমান  যুগে সমাজের সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন । বিংশ শতাব্দীর আগে যারা ছিলেন তাদের কাছে তথ্য তেমন ছিল না , তবু অত্যন্ত সীমিত তথ্য নিয়েও  তারা কাজ করেছেন; অর্থনীতি যে সমাজে র সমস্যা র কথা ভাববে , রাজনীতি আর অর্থনীতি যে জড়িত এ নিয়ে অনেক ভাবনা আগেও হয়েছে ।  সবার ভাবনা চিন্তা অবশ্যই এক ছিল না । কুজনেৎস তো স্বপ্ন ই  দেখিয়ে দিলেন যে  পুঁজিবাদ নিজের সমস্যা অচিরেই মিটিয়ে নেবে নিজেই এবং পুঁজির যথেষ্ট বৃদ্ধি র পর, বৈষম্যের কিছু বৃদ্ধির পর এমন দিন আসবে যেদিন বৈষম্য কমতে থাকবে । কিন্তু তা হলো কোথায় ? আর, অনেক অর্থনীতিবিদ  বলে দিলেন মার্কস এর পুঁজিবাদের সংকট এর তত্বে তথ্যের জোর নেই , কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো লিখে  অর্থনীতিবিদ কেন রাজনীতি তে জড়িয়ে যাবেন , পুঁজি বিহীন সমাজ এক অবাস্তব চিন্তা।

পিকেটি বললেন তার বই এর নামকরণ মার্কস এর “দাস ক্যাপিটাল” কে অনুকরণ করার চেষ্টা নয় , বা মার্কস এর তত্ব এর প্রতি তার আস্থা নেই, যদিও তার তথ্য কার্ল মার্কস এর দেড়শো বছর  আগে বলে যাওয়া  অনেক কথা কেই সত্য প্রমাণিত করে দিলো ।  ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে – একটা কথা মনে রাখা দরকার , অর্থনীতি হয়তো পদার্থ, রসায়ন বিজ্ঞান বা গণিত এর মতো সম্পূর্ণভাবে জড় বস্তু, Matter, Energy, আমাদের পৃথিবী, সৌর জগৎ, ব্রম্ভান্ড আর প্রকৃতি র নিয়ম মেনেই শুধু  চলে না , অর্থনীতি মানুষকে নিয়েও । আর মানুষের সমাজের অঙ্ক এতো সহজ নয় ,  তবু অর্থনীতি সমাজের বিজ্ঞান, অর্থনীতি কোনো অনন্ত ভবিষ্যৎ বলার জ্যোতিষও নয় এবং বিজ্ঞান সম্মত বা ইতিহাসনিষ্ঠ না হয়ে তার উপায় নেই । বিজ্ঞান চিন্তা তথ্যের আগেই শুরু হতে পারে , নতুবা আইনস্টাইন আপেক্ষিকতা নিয়ে বা ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পল ডিরাক antimatter নিয়ে বলতে পারতেন না , অনেক সময় ই পরে আসে তথ্য , এবং তথ্য এসে আগের চিন্তা কে হয় সংশোধন, প্রসারণ বা আরো গ্রহণীয় করে তোলে ।  ব্যক্তিগত পুঁজি বিহীন সমাজ যদি এক অবাস্তব হয় , তবে সারা পৃথিবী জুড়ে গ্লোবাল ওয়েলথ ট্যাক্স দিয়ে সম্পদ বৈষম্য কমিয়ে ফেলা যাবে সেটা ই বা কতটা বাস্তব , আর করবেই বা কে ? এই তত্ত্বের ক্রেতা কারা বা কাদের প্রতি স্বান্তনা? বা তারাই কি রাজনীতি র চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারলেন ? অর্থনীতি এমন ই এক নীতি – রাজনৈতিক সন্ধান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারা  সম্ভব কিনা সেটাও আমাদের বিজ্ঞান এর মন নিয়ে ভাবতে হবে ।

পিকেটি র তত্ত্ব বা তথ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে । অনেক বাস্তব সমস্যা র কথা, বা যুক্তি বিজ্ঞান এর ভাবনা উনি এড়িয়ে গেলেন । বাজার এর চাহিদা কিভাবে সংকুচিত হয়ে যায় বা চাহিদা র থেকে উৎপাদন বেশি হয়ে গেলো,  শ্রম এর উপর নির্ভর না করে পুঁজির কি নিজের কোনো বৃদ্ধি হতে পারে ? ধনী মানুষ জনের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি আর তার সঞ্চয়ের ক্ষমতা কে আলাদা করে ব্যাখ্যা করলেন ।  কি ভাবে শ্রম বা শ্রমিক থেকে ও কাজে লাগে না , পুঁজি র সংকট যা কিছু ঘটে তা নাকি অল্প সময়ের – অর্থাৎ পাঁচ বছরে র সমস্যা কে পঁচিশ বছরের সমস্যার অংশ ভাবা ঠিক নয় ।

সব অর্থনীতিক সব কিছু নিয়ে ভাবতে বসবেন এতটা আশা করা কি ঠিক হবে ? সমস্যাটা যাদের হয়তো ভাবতে হবে তাদেরকেই ।  পুঁজি তার আপন সংসারের গন্ডি না কাটালে বাড়বে কি করে ? পুঁজি র তো দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু ও ঘটে যেতে পারে ।  পুঁজি না হয় বিদেশী ফ্লাইট এ গেলো ।  শ্রম বা শ্রমিক কে ভিসা দেবে কে ?  বিদেশী শ্রমিক এর ভিসা সেন্সর হোক, পুঁজি র ভিসা কে আটকে দিও না , দেশে দেশে এই বার্তা রটিয়ে দাও । পুঁজি ছাড়া উন্নতিশীল দেশের উন্নতি কে করবে ?  পুঁজি কে যে হতে হবে সর্বত্রগামী । নয়া উদারবাদী মুক্ত স্বাধীন অর্থনীতি ।  সারা পৃথিবী র শিক্ষা স্বাস্থ জল, বায়ু, খনিজ, প্রাকৃত সম্পদ  তুলে দাও পুঁজি র হাতে –  পুঁজি কে হতে হবে মুক্ত, স্বাধীন ।  পুঁজি মুক্ত হয়ে সারা পৃথিবী কে মুক্ত করবে এক দিন সব বৈষম্য এর থেকে । সাধারণ মানুষ যত খুশি সাধারণ বিজ্ঞান অঙ্ক নিয়ে ভাবুক না  । সমাজ এর অঙ্ক বেশি আলোচনা হতে থাকলে, প্রশ্ন উঠতে থাকলে কি হবে কে বলতে পারে ?  

শ্রম কে এড়িয়ে পুঁজি র মুক্ত ছাড়পত্র ঘোষণা করতে চাইছে কারা ? সাধারণ মানুষের যে বিরাট বিপুল অংশ – যাদের সম্পদ নেই, থাকলেও অত্যন্ত কম – তাদের ভাবতে হবে যে অর্থনীতি র গতি কোন দিকে চলেছে বা কারা চালাতে চাইছে ? যারা চালাতে চাইছে বা পারছে  – তারা কি সাধারণ মানুষ কে ক্ষমতা দিতে চলেছে ? সম্পদের অধিকার ? অধিকার কি পুজো করে ভগবানের আশীর্বাদ এর মতো পাওয়া যায় ?  উপযুক্ত আয়ে, উপযুক্ত শিক্ষা – স্বাস্থ্যে বেঁচে থাকার, এগিয়ে চলার অধিকার ? মানুষের শিক্ষা , স্বাস্থ  আর  উন্নতি র অনেক ডেটা , অনেক সব তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবে কারা ? এই দেশ, রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম ,অর্থনীতি, শিক্ষা কাদের জন্য ? গণতন্ত্র  কি আসছে ? “ for the people, of the people, by the people” ?



Categories: Uncategorized

Tags:

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: